৯৫। সূরা আত-ত্বীন (ডুমুর)
সূরার সারসংক্ষেপঃ
সূরা আত-ত্বীন এর শুরুতে ৪ টি শপথ করা হয়েছে। এই শপথ করার পর ৪র্থ আয়াতে একটি মন্তব্য করেছেন আল্লাহ। এই শপথ ও শপথের পরবর্তি মন্তব্যের সাথে গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
যদিও ত্বীন ও যায়তুন দুটি উপকারী ও বৈশিষ্ট্যমন্ডিৎ ফল তবুও সম্ভবত ত্বীন দ্বারা এমন জায়গার কথা বলা হচ্ছে যা যেখানে এটা বেশি জন্মে আর তা হলো শাম, ফিলিস্তিন অঞ্চল। জুদি পাহাড়, যেখানে নূহ (আঃ) এর নৌকা ভিড়েছিল সেই অঞ্চলে ত্বীন ফল বেশি জন্মে, যায়তুনের পাহাড় যা জেরুসালেম এ অবস্থিত এবং তা ঈসা (আঃ) এর এর সাথে সম্পর্কিত। তুর এ সাইনা, সিনাই পাহাড় তো সরাসরি মূসা (আঃ) এর সাথে সম্পর্কিত যেখানে দাঁড়িয়ে তিনি আল্লাহর সাথে কথা বলেছিলেন। আর নিরাপদ নগরী মক্কা সরাসরি ইবরাহীম (আঃ) এর সাথে জড়িত যিনি এই নগরের স্থপতি বলা যায় আর সব শেষে মুহাম্মাদ (সঃ) এই নগরের পূর্নতা দান করেন।
সুতরাং ১ম ৩ আয়াতে ৫ জন শক্তিমান নবী (সহ আরো কিছু নবী)দের কথা ইঙ্গিত করা হচ্ছে যারা হলেন হযরত নূহ (আঃ), ঈসা (আঃ), মূসা (আঃ), ইবরাহীম (আঃ), মুহাম্মাদ (সঃ)। ইনারা পৃথিবী ও মানব সভ্যতার শ্রেষ্ঠতম মানুষ। ৪র্থ আয়াতে আল্লাহ বলছেন, আমি মানুষকে পয়দা করেছি সর্বোত্তম গঠনে। আল্লাহ আল কুরআনে অনেক কিছুই সৃষ্টি করেছেন বলেছেন কিন্তু মানুষের মত অন্য কোন বিশেষন লাগাননি। অর্থাৎ তিনি স্পেশাল ভাবে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। অর্থাৎ মানুষকে যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে তার সাথে সামঙ্গস্য রেখেই শরীর ও মন-মস্তিষ্ক সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ। শপথের কি অসাধারন ফিনিশিং!!! এই বক্তব্যটাই সূরার মূল বক্তব্য যা শুরুতে ৪ টি শপথের বিষয় দিয়ে আল্লাহ প্রমান করে দিয়েছেন। অসাধারন!!!
আল্লাহ মানুষকে অতি উত্তম গঠনে সৃষ্টি করেছেন। দৈহিক গঠনের
পাশাপাশি আত্মিক গঠনও আল্লাহ সুন্দর করেছেন। অন্যান্য প্রানীদের তুলনায় বিবেক,
বুদ্ধি, নীতি-নৈতিকতার চরম শিখরে মানুষকে উত্তোলন করেছেন।
আল্লাহ মানুষকে অন্য সৃষ্টি থেকে শ্রেষ্ঠত্য দান করলেও মানুষ অবুঝের মত নিজের চাইতে নিম্নমানের প্রাকৃতিক শক্তি, জড় বস্তু, উদ্ভিদ বা প্রানীর কাছে নিজেকে সমর্পন করছে। অর্থাৎ নিজের গঠন ও সৃষ্টা প্রদত্ত শ্রেষ্ঠত্যের মর্যাদা রাখতে না পেরে নিম্নমানের কিছুর সামনে মাথা নত করছে। এভাবেই মানুষ নিজেই নিজেকে নীচু স্তরে নামিয়ে নিচ্ছে; তাই হতাশ হয়ে এই কথাটি আল্লাহ সুন্দরভাবে নিজের স্টাইলে ৪ ও ৫ নং আয়াতে বলে দিয়েছেন।
পৃথিবীর সকল প্রাকৃতিক শক্তি, জীব, জড় এর চেয়ে মানুষ শ্রেষ্ঠ। কিন্তু তা সত্ত্বেও মানুষ স্রষ্টার দাসত্ব না করে সৃষ্টির দাসত্ব করতে শুরু করে। সকল শক্তি ও জড় এর নিজস্ব বিবেক বুদ্ধি ব্যবহারের সুযোগ নেই। আল্লাহর নির্ধারিত নিয়ম নীতিই মেনে চলে। শুধু প্রানীরাই বিবেক, বুদ্ধি ব্যবহার করে কিন্তু তাদের মানুষের মত এত উন্নত বিবেক, বুদ্ধি নেই। তবুও তারা সাধারনত ভালোভাবেই তাদের বিবেক বুদ্ধি ব্যবহার করে। কিন্তু মানুষ ব্যতিক্রম।
অন্যান্য প্রানীরা ক্ষুধার্ত না হলে বা বড় কোন ক্ষতির আশঙ্কা না করলে অন্যের ক্ষতি করে না, অবিচার করে না। কিন্তু কিছু মানুষ সামান্য কারনে বা অকারনে মানুষ হত্যা, সম্পদ ধবংসে লিপ্ত হয়। যা তাদেরকে অন্যান্য সকল প্রানীদের থেকেও নিচু স্তরে নামিয়ে দেয়।
সুতরাং নৈতিক অবক্ষয়ের কারনে মানুষ নিচে নেমে যায়। শ্রেষ্ঠতার
জন্য চাই দৈহিক/শারিরীক এবং নৈতিক/মানসিক ২ ধরনের বিষয়ের পারফেক্ট ব্যালান্স (যা
দেখিয়ে গেছেন নবীগন) এবং এই পারফেক্ট ব্যালান্স কিভাবে করতে হবে তা বলা হয়েছে
সূরার ৬ নং আয়াতে; তা হলো ঈমান আনা (মূলত নৈতিক/মানসিক কর্মকান্ড) ও সৎ/ভালো কাজ
করা (মূলত দৈহিক/শারিরীক কর্মকান্ড)। যারা এমন করবে তারা অশেষ পুরষ্কার পাবে। এই পুরষ্কার শুধুমাত্র দুনিয়ায় বা শুধুমাত্র আখিরাতে নয়, বরং তা হবে Continuous, Endless reward
৭ম আয়াতে বলা হচ্ছে, এই সব এর পরও কি আছে বা এমন কে আছে যে কিয়ামত সম্পর্কে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে পারে? অর্থাৎ যে মিথ্যা প্রতিপন্ন করবে সে কি নিচু স্তরের নয়? এটা কীভাবে যুক্তিযুক্ত হতে পারে যে, আল্লাহ এত সুন্দরভাবে অর্থপূর্ন একটি সৃষ্টি করলেন কিন্তু এর একটি সঠিক, সুন্দর, উদ্দেশ্যপূর্ন পরিনতি থাকবে না? হ্যাঁ। এই সুন্দর সৃষতির সুন্দর পরিনতি হলো একে বিচারের আওতায় আনা।
শেষ আয়াতে আল্লাহ প্রশ্ন রেখেছেন যে আল্লাহই কি শ্রেষ্ঠতম জ্ঞানী/বিচারক নন? যিনি পুরষ্কার ও শাস্তি দিতে পারেন। এই আয়াত বলতে গিয়ে আল্লাহ 3rd person ইউজ করেছেন, নিজেকে দূরে রেখেছেন। কারন একজন জ্ঞানী বিচারক নিরপেক্ষ হন, তিনি বিচারপ্রার্থীর সাথে যোগসাজস করেন না, তাদের সাথে স্বজনপ্রীতি করেন না।
আগের সূরার সাথে সম্পর্কঃ
মূলত আগের কয়েকটি সূরার সাথে এই সূরার যোগসূত্র রয়েছে। আগের ৪ টি সূরা (৯১ তম সূরা আস শামস, ৯২ তম সূরা আল লাইল, ৯৩ তম সূরা আদ দুহা, ৯৪ তম সূরা আল ইনশিরাহ এর সাথে মিলিয়ে পড়লে ও চিন্তা করে দেখলে এই মিল পাওয়া যায়। সূরা আস শামস এও মানবের উত্তম গঠন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে (আয়াত ৭) এবং নিজেকে পরিশুদ্ধ করার বিষয়টি এসেছে (আয়াত ৯)। এই সূরায় ভালো (সফল) ও খারাপ (বিফল) ২ ধরনের মানুষের কথাই এসেছে।
সূরা আল লাইলে মূলত ভালো মানুষের একটি স্তর (সাহাবী) এর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। পরের ২ টি সূরায় সরাসরি মুহাম্মাদ (স) এর কথা এসেছে। সূরা দুহায় মুহাম্মাদ (স) কে সান্তনা দেওয়া হয়েছে ও তাঁর প্রতি অনুগ্রহ বর্ননা করা হয়েছে এবং সূরা আল ইনশিরাহ তে মুহাম্মাদ (স) কে সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করা হয়েছে। অর্থাৎ সূরা আস শামস এ আগের ৩ টি সূরায় ভালো (সফল) ও খারাপ (বিফল) ২ ধরনের মানুষের কথা আনার পর আল্লাহ ৯২-৯৪ এই ৩ সূরায় মানুষের ভালো থেকে ভালোর দিকে অর্থাৎ উচু থেকে উচু স্তরে ক্রমানুসারে উঠিয়েছেন (সাহাবী-নবী মুহাম্মাদ)। এরপর আল্লাহ আবার মানুষের নিচু থেকে নিচু স্তরে নামিয়ে দিয়েছেন এই সূরায় (৯৫ তম সূরা আত ত্বীন এ)। কি অসাধারন সিকুয়েন্স!!!
পরের সূরার সাথে সম্পর্কঃ
৯৫ নং সূরা আত ত্বীন এ আল্লাহর নবীদের বড়ত্বের কথা বলা হয়েছে (আয়াত ১-৩), ৯৬ নং সূরা আল আলাক্ব এ আল্লাহর বড়ত্বের কথা বলা হয়েছে (আয়াত ৩)। সূরা আত ত্বীন এ মানুষকে উত্তম করে সৃষ্টি করা হয়েছে তা বর্নিত হয়েছে (আয়াত ৪), সূরা আল আলাক্ব এ মানুষ যে উত্তম তাঁর নমুনা (শিক্ষাগ্রহন) বর্ননা করা হয়েছে (আয়াত ৪-৫)। ত্বীন এ মানুষকে নিচু থেকে নিচু স্তরে নামিয়ে দেওয়ার বিষয়টি এসেছে আয়াত ৫ এ অন্যদিকে আলাক্ব এ নিচু থেকে নিচু স্তরে নেমে যাওয়ার কারন বর্নিত হয়েছে আয়াত ৬-১৪ তে। প্রথমে (আত্মিক) ঈমান ও পরে (দৈহিক) কাজ এর কথা এসেছে (আয়াত ৬) ত্বীন এ যার বিপরীতে প্রথমে (দৈহিক) কাজ ও পরে (আত্মিক) ঈমান এর কথা এসেছে আলাক্ব এ আয়াত ১৯ তে। সূরা আত ত্বীন এ এমন ব্যক্তির বিষয় এসেছে যে সব জানা সত্ত্বেও আখিরাতকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে (আয়াত ৭) আর সূরা আল আলাক্ব এ আখিরাতকে মিথ্যা প্রতিপন্নকারী ব্যক্তির চরিত্র ভালোভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে (আয়াত ৬-১৪)। আল্লাহ শ্রেষ্ঠ বিচারক এবং জ্ঞানী এ কথাটি বলা হয়েছে সূরা আত ত্বীন এর আয়াত ৮ এ এবং আল্লাহর বিচারের ও জ্ঞানের প্রয়োগের বিষয়টি এসেছে আয়াত ৩-৫, ১৫ এ। কি অসাধারন সিকুয়েন্স,
বিশেষ বিষয়ঃ
সূরা আত ত্বীন এ কসম করা হয়েছে নিরাপদ শহরের (মক্কার)। মানুষ তো এই শহরে নিরাপদই এমনকি বনের পশুদের মেরে ফেলা এবং গাছপালা পর্যন্ত কেটে ফেলা আরববাসীদের নিকট হারাম। সবাই এখানে নিরাপত্তা লাভ করে তাই একে নিরাপদ শহর বলা হয়। কিন্তু সূরা আল বালাদের শুরুতে একইভাবে কসম করা হয়েছে নগরের কিন্তু তখন তাকে নিরাপদ বলা হয় নাই। কারন সেই সময়ে অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, নবী মুহাম্মাদ (স) এর জন্য সেখানে কোন নিরাপত্তা ছিলো না। তাকে কষ্ট ও যন্ত্রনা দেয়া এবং তাকে হত্যা করার উপায় উদ্ভাবন করা হালাল করে নেয়া হয়েছিল। কি সুক্ষ একটা শব্দের প্রয়োগ কি আসাধারন বৃহৎ অর্থ বহন করে। এমন ভাষাশৈলী শুধু স্রষ্টার বানীতেই পাওয়া সম্ভব।
:)









মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন